পুঁজিবাজারে লেনদেনের স্বাভাবিকতা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা প্রি-ওপেনিং সেশন পুনরায় চালুর সম্ভাবনা পর্যালোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন দেশের শীর্ষ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি, তারল্য সংকট, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন বিষয় নিয়ে গতকাল শীর্ষ ব্রোকারেজ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসি (ডিএসই)। ডিএসইর বোর্ডরুমে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সংগঠনটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। পুঁজিবাজারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে অংশীজনদের মতামত ও বাস্তব অভিজ্ঞতা জানতে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
বৈঠকের শুরুতে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, ‘পুঁজিবাজারের উন্নয়নে অংশীজনদের যৌক্তিক ও গঠনমূলক পরামর্শ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব প্রস্তাব ডিএসইর বোর্ড ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) অবহিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।’
তিনি জানান, ‘ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এ কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া সাম্প্রতিক পাঁচটি ব্রোকারেজ-সংক্রান্ত ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের বিষয়েও ডিএসই কাজ করছে।’
বৈঠকে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পুঁজিবাজারের কিছু দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয় এখনো রয়েছে। একই সঙ্গে বাজার বর্তমানে কঠিন ও হতাশাজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতির কারণ চিহ্নিত করার পাশাপাশি তা থেকে উত্তরণের বাস্তবসম্মত উপায় বের করা প্রয়োজন।’
তিনি আরো বলেন, ‘অতীতের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর পাশাপাশি বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সমস্যাগুলো তুলে ধরার সময় সেগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রস্তাবও দিতে হবে। শুধু সমস্যা চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়, কার্যকর সমাধানের পথও খুঁজে বের করতে হবে।’
বৈঠকে অংশগ্রহণকারী ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি, বাজারের স্থিতিশীলতা, তারল্য বৃদ্ধি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেন। দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন বিষয়গুলো দ্রুত পর্যালোচনা করে বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার ওপর তারা গুরুত্বারোপ করেন।
বক্তারা নতুন ট্রেডিং কৌশল ও পণ্য প্রবর্তনের পাশাপাশি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা প্রি-ওপেনিং সেশন পুনরায় চালুর কারিগরি ও বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা পর্যালোচনার প্রস্তাব দেন। তাদের মতে, বাজারে লেনদেনের কার্যকারিতা বাড়াতে এ ধরনের কাঠামোগত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ স্কিমের মেয়াদ ও ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সময় বাড়ানোর বিষয়টি পর্যালোচনার প্রস্তাব দেয়া হয়। পাশাপাশি মেম্বারস মার্জিন নেট-অফের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ব্যয় ও তারল্য ব্যবস্থাপনার চাপ কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তারা।
ইন্সপেকশন ও সার্ভেইল্যান্স কার্যক্রমকে আরো নিয়মিত, তথ্যনির্ভর, ঝুঁকিভিত্তিক ও স্বচ্ছ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বৈঠকে অংশ নেয়া প্রতিনিধিরা। সিস্টেমভিত্তিক তথ্য যাচাইয়ের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া এবং স্বাভাবিক ট্রেডিং ভলিউমের পরিবর্তে অস্বাভাবিক মূল্য পরিবর্তন ও প্রকৃত অনিয়মের লক্ষণকে অধিক গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দেন তারা।
বক্তারা পুঁজিবাজারকে শুধু ইকুইটি-নির্ভরতা থেকে বের করে বন্ডসহ অন্যান্য আর্থিক ইনস্ট্রুমেন্টের পরিধি বাড়ানোর ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে ডিলারদের ভূমিকা ও দায়িত্ব নির্ধারণে আরো সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রণয়নের প্রস্তাব দেয়া হয়।
বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত ও প্রক্রিয়াগত বাধাগুলো চিহ্নিত করে তা দূর করা, বিনিয়োগকারীকেন্দ্রিক সেমিনার ও সংলাপ আয়োজন এবং উচ্চ সম্পদসম্পন্ন বিনিয়োগকারী ও প্রকৃত মার্কেট প্লেয়ারদের সঙ্গে ডিএসইর সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়। এছাড়া দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে শেয়ার বাইব্যাকের সুযোগ চালুর সম্ভাবনা পর্যালোচনার আহ্বান জানান তারা।
বৈঠকে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার আরো বলেন, ‘ডিএসইর আইটি ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা বোর্ড অনুমোদন করেছে এবং তা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। বিনিয়োগকারী সুরক্ষায় ইন্সপেকশন ও সার্ভেইল্যান্স কার্যক্রম আরো কার্যকর করতে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং তথ্যভিত্তিক সফটওয়্যার উন্নয়নে কাজ চলছে। এতে ইন্সপেকশন প্রক্রিয়া আরো কাঠামোবদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি ডেটা রিকনসিলিয়েশন সহজ হবে।’
বিএসইসির উদ্যোগে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল), সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল) ও আইটি টিমের সমন্বয়ে নিয়মিত সভা আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি। অনলাইন অ্যাকাউন্ট খোলা, রিটেইল বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজ করা, টি+১ সেটেলমেন্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে।
নতুন ওয়েবসাইট প্রসঙ্গে নুজহাত আনোয়ার বলেন, ‘ওয়েবসাইটটির উন্নয়নকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বরের প্রেস কনফারেন্সে এটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে পুরনো ওয়েবসাইট আরো দুই-তিন মাস চালু রাখা হবে। ব্যবহারকারীদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় উন্নয়নও করা হবে।’